মুখবন্ধ

ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী

শুক্রবার বিকেলের এক পশলা বরফ বৃষ্টির সাথে শুরু হলো আমাদের ফিনল্যাণ্ড এর দুর্গাপূজা। প্রতি বছরের মতো প্রয়োজনীয় জাঁকজমক সহ দেবীর আরাধনা ও দুর্গোৎসবের শুরু। বহুদিনের প্রয়োজনীয় একটি আটকে থাকা কাজ এবারে আমরা সেরে নিয়েছিলাম পুজোর আগেই - আমাদের অসংগঠিত বঙ্গ সম্প্রদায়ের একটি রূপ খুবই প্রয়োজন ছিল বহুদিন ধরে। তৈরী হলো বেঙ্গলি এসোসিয়েশন অফ ফিনল্যাণ্ড (বাফ) - ফিনল্যাণ্ড এ বসবাসকারী সমস্ত বাঙালিদের এক নিজস্ব পরিচিতি দিতে এর জন্ম। যদিও আমাদের পুজোর এবারে ২১ বছর - এবং আনুষ্ঠানিক সংঘ ছাড়াও আমরা সব কাজ-ই করে এসেছি এতো দিন ধরে, তাও যেভাবে ফিনল্যাণ্ড এ বাঙালির সংখ্যা বেড়ে চলেছে, তাতে এক আনুষ্ঠানিক সংঘের প্রয়োজনীয়তা বলাই বাহুল্য। শুরুতেই আমাদের সদস্য সংখ্যা পঞ্চাশোর্ধ পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে। ছাত্র-ছাত্রী থেকে পেশাদার বাঙালি অনেকের প্রবাসী জীবনের পথচলা শুরু আজ ফিনল্যাণ্ড এ। আগামী দিনে আমরা প্রচুর নতুন সদস্য ও উদ্যোম নিয়ে এগিয়ে চলবো, এই আমাদের আশা।

নতুন সংগঠনের হাত ধরে এবারের পুজো সহ আমরা পেয়েছি নতুন লোগো, নতুন ওয়েবপেজ, আর সৃজন এখন আমাদের অনলাইন পত্রিকা, বছরে এক বার নয়, সারা বছরই আমাদের কৃষ্টি ও কলা প্রদর্শনীর নতুন মঞ্চ হিসেবে প্রাণ পেতে চলেছে সৃজন। আজকের পৃথিবীতে ব্যাক্তিগত মত প্রকাশের স্বাধীনতা যখন অক্রান্ত, তখন সৃজন হয়ে উঠুক আমাদের ভাব প্রকাশের মঞ্চ - কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী -এসপো থেকে ওউলু - যে ঘটনাগুলো আমাদের নাড়া দেয়, তার আলোচনার ক্যানভাস। তুলির আর কলমের ছোঁয়ায় ঝলসে উঠুক মন। আলোচনায় আসুক ধর্মীয় রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা ও প্রাসঙ্গিকতা - ডিজিটাল ইন্ডিয়া-র ছোঁয়ায় দেশের শিক্ষা, সমাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পথচলা। শুধু আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট নয়, ছবি-গল্প-কবিতায় আসুক প্রেম, ভালোবাসার, অনুভূতির ছোঁয়ায় পাথুরে মনে কে ছুঁয়ে ফেলার। আমাদের আশা সৃজন হয়ে উঠবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিফলন। বহুদূরে ফেলে আশা আমাদের কৈশোর, যৌবন ও ছোট ছোট ভালোবাসা-ভালোলাগার বল্গাহীন স্রোত আমাদের ভরিয়ে দিক এই প্রবাসের আবেগহীন সমুদ্রে।

বাফ-এর প্রাণপ্রতিষ্টার মতোই প্রয়োজনীয় কাজ তড়িঘড়ি শেষ করে নতুন উদ্দ্যমগুলি কে এগোতে হয়েছে বিগত একটি মাসে। পথ চলতে গিয়ে ভুল ভ্রান্তি হওয়াটাই স্বাভাবিক, কিন্তু থেমে যাওয়া অপরাধ। থেমে না থাকাই যখন জীবন, তখন এসো আমরা একসাথে পথ চলার অঙ্গীকার এ আবদ্ধ হয়ে ফিনল্যান্ডের হিমশীতল আবহাওয়াকে একটু উষ্ণতায় ভরিয়ে দেই। আমাদের বেঙ্গলি এসোসিয়েশন অফ ফিনল্যাণ্ড নামের শিশুটিকে পরিণিত হতে সাহায্য করি, সবাই মিলে। বাড়িয়ে দাও তোমার হাত..

ত্রিনয়নী

সুশোভন দাস

বৃষ্টির চরিত্র বোঝা বড়ই কঠিন। টানা তিন মাস ধরে অঝরে ঝরার পরেও কোথা থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে কালো মেঘ এসে পুরো আকাশটা দখল করে সবকিছু ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। মহালয়ার ভোরে এমন বৃষ্টি আর ঝড় হল যে মাঠের পাশে শিমুল গাছের মোটা ডাল ভেঙে ইলেকট্রিকের তার ছিঁড়ে প্রায় দু-দিন লোডশেডিং। সারা বর্ষাকাল জুড়ে এলাকার ওলি-গলি গুলো প্রায় সবসময়ই জলের নীচে ছিল। অফিস-স্কুল-কাছারি সবকিছুই বন্ধ ছিল অনেকদিনের জন্য। এমনকি দোকান-পাঠও দিনের বেলা মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য খোলা থাকত। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি কলেরা-ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়াতে প্রাণহানির সংখ্যা দুই-অঙ্কে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতির জটিলতাকে মাথায় রেখে মাস দেড়েক আগে কর্পোরেশন থেকে লোক পাঠিয়ে ড্রেন পরিষ্কার করার পর জীবনযাত্রা কিছুটা স্বাভাবিক গতি পায়।

হাইওয়ের পাশে এই এলাকা, শিমুলতলা, এখনো পুরোপুরি শহর হয়ে না উঠলেও গ্রাম থেকে শহরে রূপান্তরের পথে অনেকদিন আগেই পাড়ি দিয়েছে। তাই গ্রামের সরল জীবনকে ভেঙে আধুনিক শহুরে সজ্জায় সেজে উঠছে দিনে দিনে। আগেকার দিনের মাটির বাড়ি, টালি বা খড়ের ছাউনি হয়েছে কংক্রিটের দেশলাই বাক্স। বাড়ির সামনের উন্মুক্ত উঠান হয়েছে খাঁচায় বন্দি ব্যালকনি। উঠেছে অনেক বহুতল বাড়ি, ফাঁকা মাঠ গুলো দখল করেছে স্কুল কলেজ অফিস কাছারি হাসপাতাল আর ক্লাব ঘর। নিজেদের জমি-জমা হারিয়ে অনেক পরিবার যেমন উঠে গেছে অন্যত্র তেমনই অনেক নতুন মানুষের আগমণ হয়েছে। সাধারণ মানুষের গায়ে ও মনে দেখা দিয়েছে শহুরে চাকচিক্য। ক্লাবগুলোর দৌলতে প্রায় প্রতি মাসে কিছু না কিছু অনুষ্ঠান লেগেই থাকে। একটা সময় যে শিমুলতলা সন্ধ্যায় শাঁখের শব্দের সাথে এক সুখের ঘুমচাদরের তলায় আস্তানা নিত সে আজ বিনিদ্র রজনী যাপন করে। সন্ধ্যায় শাঁখের শব্দের বদলে এখন শোনা যায় দাম্পত্য বা পারিবারিক কলহ কখনো টেলিভিশনে কখনো বা বাস্তবে। সূর্যাস্তের পর এখন নামে এক গাঢ় অন্ধকারের চাদর যার আচ্ছাদনে শিমুলতলা নেয় এক অন্য রূপ, দিনের শিমুলতলার সাথে যার মিল শুধু মাত্র ভৌগোলিক অবস্থানেই।

এই এলাকার এক অত্যন্ত প্রবীণ মানুষ হলেন হৃষিকেশ গাঙ্গুলি। একটা সময় প্রচুর জমি-জমার মালিক ছিলেন কিন্তু বর্তমানে শুধু মাত্র নিজের বসত বাড়িটুকু ছাড়া আর কিছুই রক্ষা করতে পারেন নি। রেলে কর্মরত অবস্থায় তিনি এই এলাকায় আসেন এবং তারপর এখানেই থেকে যান। হৃষিকেশ বাবুর একমাত্র ছেলে সুকুমার, ক্লাবঘর জুয়া আর মদের নেশায় পৈত্রিক সম্পত্তি ও নিজের যৌবন প্রায় অর্ধেক শেষ করার পর বাবার চেষ্টায় স্থান পায় রেলের অধস্তন কর্মচারীর পদে। তারপরেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তার জীবনে আসে এক ফুটফুটে কন্যা সন্তান। সন্তান আগমনের সম্ভাবনার খবর পাওয়ার পরপরই সুকুমারের জীবন অন্ধকার জগৎ ছেড়ে আলোর পথে ফিরে আসে। সুকুমারের এই পরিবর্তন দেখে হৃষিকেশ বাবু নাতনীর নাম রাখেন জ্যোতি। মা-বাবা ও দাদুর আদরে বড় হয়ে ওঠা জ্যোতির জীবনে কোনো কিছুরই কালো ছায়া তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনায় খুব ভালো হওয়ার সাথে সাথে নাচে ও গানে সমপারদর্শীতা তাকে সবার মনের মাঝে একটা জায়গা বানিয়ে নিতে সাহায্য করে। নিত্য-নতুন স্বপ্ন বোনা ও তা বাস্তবায়িত করাই তার জীবনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। বয়সের সাথে সাথে তার স্বপ্নগুলোও আরও রঙিন ও কল্পনা প্রবন হয়ে ওঠে। পড়ন্ত বিকালে নিজেদের বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে গগনচুম্বী ইমারত গুলোর উপর দিয়ে ভেসে যাওয়া মেঘপুঞ্জের দিকে কৌতুহলী দৃষ্টি তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় স্বপ্নের জগতে। এক হাতে দাঁড় টেনে ভাসিয়ে দেয় তার স্বপ্নের ভেলা কোনো এক অদেখা-অজানার পথে। হয়তো কোথাও থামবে ক্ষণিকের জন্য কখনো বা কিছু দীর্ঘক্ষণ, তবু এগিয়ে যেতেই হবে নাহলে তার স্বপ্নই থমকে যাবে।

মাধ্যামিক পাস করার পর জ্যোতিকে ছোটবেলার স্কুল ছেড়ে একটু দূরের স্কুলে ভর্তি হতে হয়। এই স্কুলটা এলাকার মধ্যে হলেও হেঁটে যেতে প্রায় বিশ-পঁচিশ মিনিট লাগে। বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব বাড়ার সাথে সাথে টিউশানির সংখ্যাও বেড়ে যায় সমপরিমানে। নতুন স্কুল, টিউশানি, বেড়ে ওঠা বন্ধুদের দল, প্রথম হাতে পাওয়া স্মার্ট ফোন, বাবা ও দাদুর কাছে পাওয়া হাত খরচের টাকা, স্কুল বাঙ্ক মেরে পার্কে ও সিনেমা হলে যাওয়া, প্রথম কোনো ছেলের থেকে পাওয়া ভালোবাসার অঙ্গীকার – সব কিছু মিলিয়ে জ্যোতির জীবন হয়ে ওঠে বর্ণময় রামধনু। কিন্তু না চাইতেও কিছু টুকরো কালো মেঘের আনাগোনা শুরু হয় তার প্রাণোচ্ছল জীবনের আকাশে। টিউশানি ও স্কুল যাওয়ার পথে রাস্তার ধারে রেলিং-এর উপর বসে থাকা কিছু বখাটে ছেলেদের দৃষ্টি ও ভাষা তার শরীর ও মনের উপর আনে বিষণ্ণতার আবেশ। ভাগাড়ে মরা জন্তু পড়লে মেঘের বুক চিরে আকাশের অনেক উঁচু থেকে শকুন যেমন নজর রাখে তেমনই শানিত ছুরির ধার এদের দৃষ্টিতে। তার উদ্দ্যেশে ভেসে আসা কিছু কথা যেন জ্বলন্ত লাভা কানে ঢেলে দেওয়ার মতই বেদনাদায়ক। তবু তাকে এই পথেই আসতে হবে প্রতিদিন। অন্য পথ আছে কিন্তু সে পথও পরিষ্কার নয়। জঞ্জালের আড়ত কোনো রাস্তাকেই অব্যাহতি দেয়নি।

প্রথম কিছুদিন বাবা তাকে স্কুলে পৌঁছে দিয়েছিল কিন্তু ফিরতে হয়েছিল একা একা। তারপর স্কুলের কিছু মেয়ে মিলে একসাথে আসা-যাওয়া শুরু করে। দলবদ্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও প্রত্যেকের মনে একটা ভয়ের বাসা অনেকদিন আগে থেকেই বেঁধেছিল। স্কুল যাওয়ার সময় ছেলেগুলোর খুব একটা দেখা পাওয়া যেত না, দৈবাৎ দু-একজন কে ছন্নছাড়া হয়ে এ-গলি ও-গলিতে দেখা মিলিত। কিন্তু বিকালে স্কুল থেকে ফেরার সময় বা একটু সন্ধ্যায় টিউশানি থেকে ফেরার পথে তাদের অবশ্যই দেখা পাওয়া যেত। কিন্তু কখন কোথায় তাদের উদয় হবে তা ছিল সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। কখনো হঠাৎ করে একটা গলি পেরিয়ে অন্য গলিতে ঢোকার মুখে একেবারে সামনাসামনি হাজির হতো কখনো বা টিমটিমে আলো জ্বালানো চায়ের দোকান থেকে হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসতো নানাবিধ মন্তব্যের সাথে। কখনো কখনো দু-তিনটে গলি তাদের পিছু নিয়ে হঠাৎ করেই উধাও হয়ে যেত। বাড়িতে কয়েকবার এই ঘটনা জানানোর পর খুব যে কিছু লাভ হয়েছে তা নয়। যখনি মেয়েদের সাথে তাদের বাবা-মা বা বয়স্ক মানুষ থাকতো তাদের টিকিটিও দেখা যেত না। এমনভাবেই কেটে গেল জ্যোতির স্কুল জীবন।

কলেজে ওঠার পর পরই জ্যোতি লক্ষ্য করল, ফেরার পথে প্রায় প্রতিদিন কয়েকটা ছেলে কিছুটা দূর থেকে তাকে অনুসরণ করতে করতে তাদের বাড়ির খুব কাছাকাছি চলে আসছে। কয়েকদিন এমন হওয়ার পর একদিন বাড়ি ফেরার পথে জ্যোতি হঠাৎ করেই পিছন ফিরে তাকায়। সাথে সাথে সেই পাঁচ-ছয়টা ছেলে যে যার মতো এদিক ওদিকে মুখ লুকিয়ে নিজেদেরকে আড়াল করল। কাকতালীয় ভাবে এরপর থেকে কয়েক সপ্তাহ তাদের উপদ্রব একেবারেই লোপাট হয়ে গেল। এমনকি দূর থেকে কোনো বাজে মন্তব্য পর্যন্ত কানে এলো না জ্যোতির। এতো সহজে এতদিনের একটা সমস্যা কেটে যাবে এটা একেবারেই তার কাছে অভাবনীয়। জ্যোতি সেদিনের হঠাৎ করে ফিরে তাকানোর ফলাফলটা বেশ মন খুলে উপভোগ করছে, যেন অনেক দিন পর একটা মুক্তির স্বাদ তার শরীর মন জুড়ে বয়ে চলেছে। বেশ কিছুদিন এমনটা চলার পর একদিন কলেজ যাওয়ার পথে একটা কাগজের গোলা তার গায়ে লেগে গড়িয়ে গড়িয়ে রাস্তার ধরে চলে গেল। থমকে গিয়ে চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখতে পেল সেই ছেলেদের দলের মধ্যে একজন ইশারা করে কাগজটা তুলে নেওয়ার কথা বলছে। মুখের উপর প্রচন্ড রাগ ভাব এনে সেখান থেকে সে চলে আসে। সেদিন ফেরার পথে ওই ছেলেটাই কাগজটা হাতে নিয়ে রাস্তার এক ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। অনেকটা দূর থেকে দেখতে পেয়ে জ্যোতি তার দিকে না তাকিয়ে হনহন করে রাস্তাটা পের হয়ে যায়। এরপর প্রতিদিন সেই কাগজটা হাতে ধরে ছেলেটা রাস্তার ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। সে কাছাকাছি এলে কাগজটা বাড়িয়ে দেয় তার দিকে আর মাঝে মাঝে বলে ওঠে -‘কাগজটা নিয়ে পড়ে দেখো।’ একটা দৃঢ় কটাক্ষ দৃষ্টি হেনে নিজের পথে এগিয়ে যেত জ্যোতি। স্বভাববশত রাগ আর অবজ্ঞায় ভর দিয়ে কিছুদিন এমনভাবেই কাটলো। কিন্তু যতদিন যাচ্ছে ছেলেটা একটু একটু করে সাহস বাড়িয়ে জ্যোতির পথ আগলে ধরছে, আর অন্য দিকে একটা অজানা আশঙ্কা জ্যোতির মনে ধীরে ধীরে বাসা বাঁধছে। সে জানতো, একবার যদি তার মনের ভয় বাইরে প্রকাশ পায় তাহলে তাকে ভয়ের অন্ধকারেই ডুবে যেতে হবে। তাই মুখে রাগ আর চোখে অবজ্ঞাটাই ধরে রাখার নিরন্তর প্রয়াস চালাতে থাকে।

এই প্রথম কলেজের বন্ধুদের সাথে দুর্গা পুজায় নিজের এলাকার বাইরে পা রাখল জ্যোতি। কলেজের বন্ধুদের সাথে পুজোর চারটে দিন খুব আনন্দ করে কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে এলো। বিজয়া দশমীতেও সে চেয়েছিল বাবুঘাটে গিয়ে বিসর্জন দেখবে কিন্তু বাড়ি থেকে তা মেনে নিল না। দশমীর সন্ধ্যায় পরিচিতদের বাড়ি বাড়ি মিষ্টি নিয়ে গুরুজনদের প্রণাম করে আসার রীতি অনেক কাল থেকেই চলে আসছে। জ্যোতিকেও তা মেনে চলতে হবে। তাই সন্ধ্যার পর মিষ্টি নিয়ে অনেকগুলো বাড়িতে ঘুরতে ঘুরতে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ে সে। প্রত্যেকের বাড়িতে কিছু না কিছু খাওয়া, বসে গল্প করা- এই সব কিছু করতে করতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ঘনিয়ে এসেছে তার খেয়াল ছিল না। একটা বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পা রাখতেই জ্যোতি দেখল রাস্তা একেবারে জন-মানব শূন্য। দূরে নদীর ঘাট থেকে ভেসে আসা মানুষের কোলাহল, ফুল-ভলিউমে মাইকের গান আর উজ্জ্বল আলোর ছটা ছাড়া আর কিছু তার অনুভুতির গোচরে এলো না। এখনও তাকে আরও দুটো বাড়িতে যেতে হবে।

নির্জন রাস্তায় কিছুটা এগিয়ে একটা গলির মুখে বাঁক নিতেই হঠাৎ করে একেবারে সামনে এসে হাজির হল চিরকুট নিয়ে পথ আগলে ধরা সেই ছেলেটা, যেন সত্যি সত্যিই মাটি ফুঁড়ে তার উদয় হল। নেশাগ্রস্থ হয়ে মাথা মুখ গুঁজে অসংলগ্ন কিছু কথা বিড়বিড় করে বলতে থাকল সে যার কিছুই জ্যোতি বুঝতে পারল না। বিরক্ত হয়ে ‘এই পথ ছাড়’- বলে ধমকে উঠল সে। ছেলেটা এবার চোখ তুলে তাকাল। কোটোর থেকে রক্ত জবার মতো লাল হয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসা চোখ দুটো দেখে জ্যোতির বুক কেঁপে উঠল। সে চোখে যেন এক ধ্বংসের আগুণ ধিক ধিক করে জ্বলছে- যে কোনো মুহূর্তে তা জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির রূপ নিতে পারে। অপ্রত্যাশিত ভাবে একটা শক্ত পাঞ্জা জ্যোতির বাঁ হাতের কব্জির উপর এসে পড়ল। নেশাগ্রস্থ গলাটা উগ্র হয়ে বলে উঠল,-‘তোর এতো দেমাক কিসের রে?’

ভয়ে কুঁকড়ে ওঠে জ্যোতি। যতটা সম্ভব নিজের গলায় জোর এনে বলল,-‘হাত ছার না হলে আমি চিৎকার করব।’ পৈশাচিক হাসির সাথে ছেলেটা বলল,-‘আজ তোর সব দেমাক ধুয়ে দেব।’ জ্যোতির কব্জির উপর থেকে ছেলেটার পাঞ্জা আলগা হতেই এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিল। কিন্তু কিছু বোঝার আগেই তার চোখ দুটো অসহ্য যন্ত্রণায় বুজে গেল, মুখের চামড়া কে যেন জোর করে তার মুখ থেকে খুবলে খুবলে তুলে নিচ্ছে। চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে। পিচ ঢালা রাস্তার উপর ফুটতে থাকে তার মুখ থেকে গলে পড়া রক্ত-মাংসের তাল। তার আর্ত-চিৎকারে আসে পাশে কিছু বাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো কিছু মানুষ। একটা হৈচৈ সোরগোল তারদিকে ছুটে আসতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে চোখের উপর নেমে আসে এক অন্ধকারের আবরণ। মাথার মধ্যে সব কিছু তালগোল পাকিয়ে চিন্তা শক্তির অবসান হয়। তার দিকে এগিয়ে আসা কোলাহলের শব্দ গুলো ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে কোথায় যেন মিলিয়ে যাচ্ছে। নিজের চিৎকারের শব্দ ও তার কানে পৌঁছাচ্ছে না এখন। গলার আওয়াজ ও নিষ্প্রভ হয়ে এল। সময়ের কাঁটা এক-পাক ঘোরার আগেই জ্ঞান হারায় জ্যোতি। গলির অন্ধকারে ছেলেটার ডান হাতে লুকিয়ে রাখা অ্যাসিড ভরা গ্লাস তার চোখে পড়েনি।

আজ বিজয়া দশমী। সন্ধ্যা হতেই চারিদিকে মাইকে ঢাকের শব্দে এলাকার কাক-পক্ষীও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এখন আর আসল ঢাক বাজানো হয়ে না, রেকর্ডিং করা ঢাকের শব্দ বাজে। আতস বাজির আলো মুহূর্তে মুহূর্তে আকাশের অনেকটা অন্ধকার মুছে দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা বাড়িতেই অতিথির আনাগোনা এতটাই বেশি যে চিৎকার চেঁচামেচিতে নিজের কথা নিজেই শুনতে পাওয়া দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটু রাত হতে অতিথিরা সব বিদায় নিলো জ্যোতির বাড়ি থেকে। টেবিলের উপর রেখে যাওয়া খাবারের গন্ধ নাকে আসছে অনেক ক্ষণ। খুব একটা খিদে নেই, তবু রাতে কিছু না খেলে ঘুম আসবে না। বিছানার পাশে রাখা ব্লাইন্ড স্টিকটা হাতে নিয়ে উঠে বসল জ্যোতি। মেঝেতে হালকা শব্দ করতে করতে বাইরে বেরিয়ে এলো।

জ্যোতিকে বাইরে আসতে দেখেই তার মা বললেন,-“খাবার গুলো এখনও ফেলে রেখেছিস মা। ঠান্ডা হয়ে যাবে তো। তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। আর কত রাত করবি বল।”

আরএকটু খিদেটা পেলেই খেয়ে নেবো। বেশি দেরী করব না। “ - বলে ধীরে ধীরে বারান্দা পেরিয়ে বাড়ির সদর দরজার সামনে থামল জ্যোতি। অতিথিরা সবে মাত্র বিদায় নিয়েছে তাই দরজাটা এখন খোলা। স্টিক দিয়ে সামনেটা একটু দেখে নিয়ে দু-পা এগিয়ে দরজার বাইরে এসে দাঁড়ালো সে। একটা দমকা হাওয়া তার খোলা চুল এলোমেলো করে দিল। স্টিকটা গুটিয়ে নিয়ে বাঁ হাতে শক্ত করে ধরল। ডান দিকের গলি পথ দিয়ে দমকা হওয়ার পিছন পিছন একটা পাঁশুটে গন্ধ তার ঝলসে যাওয়া ভ্রূয়ের মাঝে ভাঁজ ফেলল। তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় আরো প্রখর হয়ে ওঠে। তৃতীয় নেত্র তার দৃষ্টির আধার হল। হয়তো গলির ওপারে শিকারের আশায় চুপটি করে বসে আছে কোনো এক ধূর্ত শয়তান। তার রক্ত হিম করা নিঃশ্বাসের প্রতিটা উপলব্ধি জ্যোতির শিরা- উপশিরায় বিদ্যুতের চাবুক মেরে মুহুর্মুহ কাঁপিয়ে তুলছে। শয়তান আজও সুযোগ খোঁজে, অন্যের উপর নিজের পাঞ্জা বসানোর নেশা তার আজীবনের। কে জানে আজ হয়তো কারোর শরীরকে নিজের বাসনার উপাদেয় বানাবে।

সংগ্রামী মা

গৌতম সরকার

(Minnesota, USA • May 2016)

ছোটবেলার স্কুলের বন্ধু শুভাশিস আমার মাকে স্মরণ করায়, ওকেই লেখা চিঠি -

সেই কোন ছোটবেলার কথা, মানুষটাকে ভুলে যাওয়ারই কথা! তবুও তুই মনে রেখেছিস। এটা জেনে বিস্মিতও হলাম, আবার তোর স্মৃতি-শক্তির ওপর আমার শ্রদ্ধাও বাড়ল।

আমাদের বেড়ে ওঠার সময়তো আর ‘মাদারস ডে’ বলে কিছু ছিল না, পরে বড় হয়ে বিদেশে এসে এটা শিখি। এখন দেখছি ভারতেও এটা হয়! তবে তুই, আমি যখন বালিগঞ্জ গভর্নমেন্টের ক্লাস ওয়ানে পড়ি, তখনকার একদিনের কথা আমার এখনও বেশ মনে পড়ে। তখন তো মাদারস ডে থাকার কথা নয়, তবে কোন বিশেষ দিন ছিল নিশ্চয়। কারণ সেদিন আমাদের ক্লাস-টিচার ইন্দিরা-দি ব্ল্যাক বোর্ডের ওপর কেন জানি না লিখেছিলেন -

“মাকে আমার পড়ে না মনে শুধু যখন খেলতে গিয়ে হটাত অকারণে একটা কি সুর গুন গুনিয়ে কানে আমার বাজে মায়ের কথা মিলায় তখন আমার খেলার মাঝে।”

লেখার পর ইন্দিরা-দি যখন ব্ল্যাকবোর্ড থেকে আমাদের দিকে মুখ ফেরালেন, আমার পরিষ্কার মনে পড়ে, দেখি উনি অঝোরে কাঁদছেন! কে যেন একজন জিগ্যেস করেছিলো যে উনার চোখে জল কেন? তখন উনি বলেছিলেন - “বড় হোলে বুঝবে, এখন নয়”।

সেই দিন আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি যে ঐ ঠাকুমা-দিদিমার বয়সী ইন্দিরা-দি কেন কেঁদে ছিলেন। যখন বুঝলাম, তখনো কিন্তু আমি ছোটোই! শুধু মনে হয়েছিলো এই যে, ইন্দিরা-দি ভুল বলেছিলেন, তা না হোলে আমার বড় হওয়া পর্যন্ত তো অন্তত মায়ের বেঁচে থাকার কথা!

খুব ছোটবেলায় মাকে মিস করতাম; জুতোর ফিতে বেঁধে দেওয়ার জন্য, জামার বোতাম সেলাই করার জন্য, স্নান করার সময় মাথায় জল ঢালার জন্য, নারকোল-নাড়ু, নিমকি বা রসবড়া খাওয়ার জন্য, শীতকালে হাতে বোনা সোয়েটার পড়ার জন্য, এইসব। তারপর মানুষটাকে আমি প্রায় ভুলেই যেতে বসেছিলাম, যদিও বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন তত দিন আমাদের তিন ভাইকে কিছুতেই মানুষটাকে পুরোপুরি ভুলে যেতে দেননি। বাৎসরিক পরিক্ষার ফল বেড়োনোর দিন, বা ভালো কিছু করার পর বাবাকে প্রনাম করতে গেলেই বাবা পা সরিয়ে নিতেন; দেওয়ালে টাঙানো মায়ের ছবিটা দেখিয়ে বলতেন “উঁহু, আগে মা-কে”! এছাড়া মায়ের আর তেমন কন অস্তিত্বই থাকলো না তখন আর আমার জীবনে। আর থাকবেই বা কি কোরে? বন্ধু-বান্ধব, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, টেনিস, ফুটবল, সিনেমা, পড়াশোনা - এইসবের মাঝে মায়ের আর জায়গা হোল না।

মাকে আবার মনে পড়লো সেই উনিশের শেষে - যখন দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি প্রায় আসন্ন। বাবা বোধ হয় প্রথমে ঠিকঠাক বিশ্বাস করে উঠতে পারেননি যে আমার পক্ষে এই ‘বিদেশে-পাড়ি’ ব্যাপারটা আদৌ ঘটানো সম্ভব! কিন্তু যেদিন বুঝলেন যে আমাকে আর আটকানো সম্ভব নয়, সেদিন কাছে ডেকে বেশ কিছু ‘গম্ভীর’ কথা বলেছিলেন, যা শুনে আমি একেবারে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ এর আগে বাবা কোনদিন আমাকে কন গম্ভীর কথা বলেননি। বাবা সেদিন কথা শেষ করেছিলেন এই বলে যে “কন ভয় নেই, তোমার মায়ের আশীর্বাদ সঙ্গে থাকবে”। দেশ ছাড়ার দিন মনে হয়েছিলো যে বাবার আশীর্বাদটা পেলাম কি পেলাম না তা ঠিক বোঝা গেলো না, কিন্তু বাবা মারফৎ মায়ের আশীর্বাদটা ঠিকই পেলাম! এরপর আবার সেই একই ঘটনা - মাকে আবার ভুলে গেলাম। তখন বিদেশে থিতু হওয়ার সংগ্রাম, পায়ের নিচে জমি খোঁজার সংগ্রাম; তার ওপর মজলাম মেমে! মায়ের কথা ভাবার সময় কোথায়?

মাকে আবার মনে পড়লো যখন শুরু হোল আমার ‘সিঙ্গিল-ফাদারহুড’ – আমার তিন কন্যাকে নিয়ে, যখন ওদের বয়েস মাত্র ১, ৩ আর ৪! কারণ সেই একই - ওদের জুতোর ফিতে বাঁধা, স্নানের সময় ওদের মাথায় জল ঢালা, ওদের জামার বোতাম সেলাই করা, এমনকি ক্রমে ওদের সাথেই নারকোল-নাড়ু আর রসবড়া বানানো! সোয়েটারটা এখনও ওদের জন্য বা ওদের সাথে বুনে উঠতে পারিনি, পারলে গর্বিতই হতাম! তবে হ্যাঁ, মেয়েদের মাফলার বোনা শিখিয়েছি – এই আমার ‘মায়ের ছেলে’ আমিই! আমার মধ্যম কন্যা মায়ার বানানো মাফলার সযত্নে রাখা আছে আমার কাছে। এ ব্যাপারে সাহায্য করেছে আমার বছর দুই ডাক্তারি পড়ার অভিজ্ঞতা, যখন শিখেছিলাম সার্জারিতে মানুষের চামড়া সেলাই!

তবে এইসবের কোনটাই আমার কাছে তেমন ‘বিশেষ’ কিছু নয়। ‘বিশেষ’ যা, তা হোল আমার মাকে আমার চিনতে পারা। যা আমি পেরেছি বিগত ১৫ বছরে, আমার তিন কন্যাকে ‘সিঙ্গিল-ফাদার’ হিসাবে বড় করতে গিয়ে। ফেলে আসা স্মৃতি বা টুকরো ঘটনা মনে পড়ায় প্রায়ই মনে হয়েছে যে কি অসাধারণ ছিলেন এই মহিলা! সহায়-সম্বলহীন (দেশ বিভাগের পর মায়ের বাপের বাড়ি হয়েছিলো বিহারের গয়ায়, যা তখনকার দিনে কোলকাতার তুলনায় ছিল ‘বিদেশ’), আত্মীয়-পরিজনহীন (মায়ের একমাত্র ভরসা ছিল আমার বাবা, যিনি কর্মসূত্রে প্রায়ই থাকতেন অন্যত্র, আর আমরা তিন ভাই ছিলাম খুবই ছোট), প্রায়ই কপর্দক-শূন্য অবস্থায় এক ভীষণ প্রতিকূল পরিবেশে আমাদের তিন ভাইয়ের মুখ চেয়ে মায়ের বেঁচে থাকার সংগ্রাম বিগত ১৫ বছরে অনেক রসদ জুগিয়েছে আমাকে – অনেকটা প্রায় একই রকম অবস্থায় আমার তিন মেয়েকে বড় করার সংগ্রামে। প্রায়ই আমার মনে হয়েছে (বিশেষত বাচ্চাদের অসুখ-বিসুখের দিনগুলোয়, যখন কোনটা আগে সামলাবো সে ব্যাপারে হালে পানি পেতাম না) যে আমার মা পেরেছিলেন, আমাকেও পারতে হবে, পারতেই হবে!

আমার মেয়েরা বড় হয়ে গেলো, আমার এই সংগ্রাম প্রায় শেষ। মায়ের ছবিতে ফুলের মালা দেওয়া ছাড়া মাকে আর কিছু দেওয়ার সুযোগ হয়নি কন দিন। তবে প্রতিকূল পরিবেশে আমার সিঙ্গিল-ফাদারহুডের সংগ্রাম হয়ে থাকলো আমার মায়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য।

Khai khai koro keno, esho bosho ahare,
Khaobo ajob khaoa, bhoj koi jahare.
~ Sukumar Roy

Basanti Pulao
(Origin and Recipe)

Sohini Nandi

Basanti Pulao

As a Bengali, even if one has not tasted Basanti Pulao, one must have heard the name. Also known as halud misti pulao, it is a bright yellow, sweet rice dish cooked with ghee and garnished with fried cashews and raisins.

To understand the origin of this mouth-watering dish and how it became a part of Bengali kitchen, let us first explore the history of pulao. Pilaf or Pilau is a rice dish whose recipe usually involves cooking in stock, adding spices and other ingredients such as vegetables or meat. In one version, the origin of this rice cooking style can be traced back to 9th century. It is believed to have spread from Spain to Afghanistan and eventually to the rest of the world. That is the reason Spanish paella, pulao and biriyani bear some degree of similarity. The earliest documented recipe comes from books written on medical science by the 10th century Persian scholar Avicenna.

Another version points out that though the terms pallao, pulao and pilav were invented by the Persians and Arabs, it was already referred to as pallo or pulao in Sanskrit and Tamil much before the Muslim rulers invaded India. There is even reference of Yaggaseni cooking pulao in Mahabharata. Maharshi Charaka had mentioned in Ayurveda that rice cooked with meat, spinach, oil, ghee and miscellaneous fruits is tasty, heartening, restorative and nutritious.

Let’s come back to our Bengali version of the pulao. As per food researchers, Basanti pulao is believed to have originated from the Shahjahani Zard pulao. An interesting fact to note is that the royal kitchen of Shah Jahan used sugar heavily in pulao and even in meat dishes! Eventually, the Bengali zamindars got influenced by the Nawabs of Murshidabad and started using saffron in their food. It soon became a famous celebratory dish among commoners too and saffron being expensive, was substituted by turmeric.

This pulao is cooked with a special kind of aromatic rice called Gobindobhog. As it is quite difficult to find this rice variety outside West Bengal (India), I have always used Basmati rice and it tastes equally good. There are various forms of recipe for this dish, but I have written the one taught to me by my mother, who in turn was taught by her mother. Let’s have a look.

Serving: 4 persons

Preparation time: 80 minutes

Cook time: 20 minutes

Ingredients:

  • 350gm Basmati rice
  • 75gm ghee
  • 1 cinnamon stick
  • 4 pcs cardamom
  • 5 pcs cloves
  • 2 bay leaves
  • 5gm ginger paste
  • 1/2 tsp turmeric
  • 1.5 tsp sugar
  • ¼ cup cashew nuts
  • ¼ cup raisins
  • 3 green chillies
  • 0.7 litre water
  • Salt to taste

Basanti Pulao Basanti Pulao

Method:

  1. Wash and rinse the rice and spread it on a paper to air dry.
  2. When dry, transfer the rice to a bowl and mix with 65gm ghee, ginger paste, turmeric, cardamom, cinnamon, cloves, bay leaves. Rub the spices and ghee over the rice granules so that the whole rice is covered well. Let it marinate for one hour.
  3. Take a cooking pot and heat 10gm of ghee. Fry the cashew nuts until golden brown.
  4. Add the marinated rice to it and fry on medium heat until the rice becomes opaque.
  5. Add the raisins and further fry for 2 minutes.
  6. Boil water and add to the pot.
  7. Add salt and sugar and give it a light stir.
  8. Cover cook on low heat for about 15 minutes.
  9. If the rice looks too dry, add some more hot water and further cook for 5 minutes.
  10. Once the rice has been cooked to the perfect texture, cover and let it sit for 5 minutes before fluffing it.
  11. Serve warm with any vegetarian or non-vegetarian dish of your choice.

Ato kheye tobu jodi nahi othe monta —
Khao tobe kochu pora, khao tobe ghonta.

ট্রান্জিট

অরিজিৎ বেরা

হিথরো এয়ারপোর্টে ফ্লাইট্‌টা ল্যান্ড করেছে পনেরো মিনিট দেরিতে। আর মাত্র কুড়ি মিনিট পরেই কোপেনহাগেন যাবার কানেক্টিং ফ্লাইট্‌। লম্বা লম্বা পা ফেলে ট্র্যান্সফার জোনের দিকে এগোয় অভি।

সিকিউরিটিতে লম্বা লাইন। পাইথনের মতো এঁকেবেঁকে চলেছে। চেকিংয়ে আজও বোধহয় খুব কড়াকড়ি। গত সপ্তাহে ওয়েস্টমিন্সটারে সন্ত্রাসবাদী হামলার ঘা এখনো শুকোয়নি লন্ডনের শরীর থেকে।

শিকাগো থেকে ন-ঘণ্টা উড়ে এসেছে অভি। শরীরটা অসম্ভব টায়ার্ড। এরপর যদি ফ্লাইট্ মিস্ করে, তাহলে পরের ফ্লাইটের জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে কে জানে। জেট্-ল্যাগে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে যাবে সে। কাল থেকেই শুরু হচ্ছে তার কোয়ান্টাম্ ফিজিক্সের কনফারেন্স।

সিকিউরিটির পর অভি তার কেবিন লাগেজদুটো দুহাতে সামলাতে সামলাতেই প্রায় দৌড়োতে শুরু করল বোর্ডিং গেটের দিকে। কয়েক সেকেন্ড যেতে না যেতেই সে শুনতে পেলো মেয়েলি কণ্ঠে তার নামে যান্ত্রিক আহ্বান… বোর্ডিং কল। মরিয়া হয়ে পা চালিয়ে কোনও রকমে গেটে পৌঁছল অভি।

যাক্, ফ্লাইট্‌টা মিস করেনি সে।


প্লেনটা মাটি ছেড়েছে প্রায় মিনিট পনের হল। মনটা এখন বেশ রিলাক্সড্ অভির। উইন্ডো-শেড্টা অর্ধেক নামিয়ে একটা লার্জ হুইস্কির অর্ডার দেয় সে।

হুইস্কির গ্লাসটা হাতে নিয়ে, কানে হেডফোন গুঁজে, চোখ বন্ধ করে সীটে গা এলিয়ে দেয় অভি। নর্থওয়েস্টানর্ে তাদের রিসার্চ গ্রুপের বড়ো প্রজেক্টটা শেষমেশ সাকসেসফুল হয়েছে। অভি তারই রেজাল্ট প্রেজেন্ট করবে কালকের কনফারেন্সে। রীতিমতো ‘গ্রাউন্ড-ব্রেকিং’ কাজ বলেই তাদের ধারনা। সাড়া পড়ে যাবে কনফারেন্সে। ভেবে বেশ উত্তেজনা অনুভব করে অভি।

দস্তুরমতো প্রতিষ্ঠিত সায়েন্টিস্ট এখন সে… গ্রিন-কার্ড এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

চোখ বুজে স্বপ্নের জাল বুনতে বুনতে অভির হঠাৎ খেয়াল হয়, মনের মধ্যে কেমন যেন একটা অস্বস্তি উঁকি দিচ্ছে মাঝে মাঝে… ফেলুদার ভাষায় যাকে বলে ‘খট্কা’।

কপালে সামান্য ভাঁজ পড়ে অভির। সে কি কোনো কিছু ভুলে যাচ্ছে? কোনো স্কেজু্যল্ড মিটিং?… কোনো আর্জেন্ট ফোনকল?… কোনো ডকু্যমেন্ট?

হেডফোনটা কান থেকে খুলে সে এবার সোজা হয়ে বসে। মনে করার চেষ্টা করে গত কয়েক ঘণ্টার ঘটনাগুলো।

হঠাৎই বিদ্যুৎচমকের মতো একটা কথা মাথায় আসে তার।

সে যখন বোর্ডিং গেটের দিকে দৌড়োচ্ছিলো, কানে এসেছিলো তার নামে বোর্ডিং কল। অন্তত বার-দুয়েক। যতদূর মনে পড়ছে, প্রথমবার তার নামটা ডাকা হয়েছিলো যথারীতি ধারালো ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টে। কিন্তু তার ঠিক পরে-পরেই যেন একটা মেয়েলি কণ্ঠের নরম ডাক…

তাইতো!

দ্বিতীয়বার তার রীতিমতো খটোমটো নামটা ডাকা হয়েছিলো নিখুঁত বাংলা উচ্চারণে!

অভিনন্দন শিকদার…


এটা কি করে হয়? অবশ্য ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে কোনো বাঙ্গালী মহিলা ক্রু থাকতেই পারে। কিন্তু একজন বাঙ্গালীকে বিদেশের মাটিতে সম্পূর্ণ বাংলা উচ্চারণে নাম বলতে শোনা যায় কি?

“উঁহু, দিস্ ইজ কোয়াইট আনইউজুয়্যল”, ভেবে অবাক হয় অভি। আচমকা একরাশ সমুদ্রের গন্ধ মেশা হাওয়া এসে যেন তার ‘অরগ্যানাইজড্’ মনটাকে এলোমেলো করে দেয়।

গ্রিন-কার্ডের চিন্তা ছেড়ে সে একেবারে পাক্কা গোয়েন্দার মতো ভাবতে শুরু করে, কে এই রহস্যময়ী? কলকাতার কলেজ-জীবনের কোনো বান্ধবী? কোনো বন্ধুপত্নী? আত্মীয়া?

নাহ্, সেরকম তো কাউকে মনে পড়ছে না!

সরু সরু চোখে একে একে সব কেবিন-ক্রু দের লক্ষ্য করে অভি। যদি কোনো চেনা মুখ চোখে পড়ে। না তো!

তাহলে?

হঠাৎ করে চারপাশের সবকিছুকে খুব জীবন্ত মনে হয় অভির। উইন্ডো-শেড্টা তুলে দিয়ে সে জানালার বাইরে চোখ মেলে। সমগ্র চরাচর জুড়ে, অপার্থিব স্নিগ্ধতায় ভরা সিঁদুর-রঙা আলো … তার রোজকার দুনিয়ার অনেক অনেক উপরে, মেঘেদের রাজত্বে সূর্য ডুবছে।

চোখ পড়ে পাশের সীটে বসে থাকা মেয়েটির দিকে। মেয়েটি সম্ভবত স্প্যানিশ। ছোট্ট একটা স্কেচ্-প্যাড হাঁটুর উপর রেখে ছবি আঁকছে একমনে।

অভির সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মেয়েটির চোখে একটা দুষ্টুমির ঝিলিক খেলে যায়।

অভি একটু অবাক হয়। তারপরই অভির চোখ পড়ে মেয়েটির খাতায়। তার খাতায় অবিশ্বাস্য ডিটেলিংয়ে ফুটে উঠেছে রোডিনের বিশ্ববিখ্যাত ভাস্কর্য ‘লে পঁস্যর’, যার ইংরেজি নাম ‘দ্য থিঙ্কার’… তার একটা মজার ক্যারিকেচার।

তার ছবিতেও একজন সুঠাম স্বাস্থ্যবান লোক চিবুকে হাত ঠেকিয়ে বসে। খুব গভীরভাবে কিছু ভেবে চলেছে। ঠিক যেমনটি দেখা যায় রোডিনের ভাস্কর্যে। তবে এই ছবির লোকটির মুখ এক্কেবারে অভির মতো… লম্বাটে, চোখে রিম্‌লেস চশমা। চুল রীতিমতো পরিপাটি। এমনকি অভির কপালের কুঞ্চনটাও বাদ যায়নি।

দারুণ মজা পায় অভি। সেও ছোটোবেলায় খুব ভালো কার্টুন আঁকতো। বহুদিন আর কিছু আঁকা হয় না।

সপ্রতিভ গলায় সে পার্শ্ববর্তিনীকে বলে,

  • “অ্যাম্ আই য়্যোর মডেল?”
  • “য়্যু আর দ্য থিঙ্কার, আই অ্যাম্ দ্য পেন্টার…”

খাবারের  খোঁজে 

ঐশানী মিত্র, ৫ বছর 

একদিন একটা কুকুরের খুব খিদে পেয়েছে। সে খাবার খুঁজতে খুঁজতে খরগোশের কাছে গিয়ে বললো ‘আমার খুব খিদে পেয়েছে। তোমার কাছে কিছু খাবার পাওয়া যাবে? খরগোশ বললো ‘আমি তো গাজর খাই। গাজর আছে। তুমি খাবে?’ কুকুর গাজার ভালোবাসে না। সে তাই আবার খাবার খুঁজতে গেলো। এবার একটা জিরাফের সাথে দেখা হলো। জিরাফ বললো ‘আমার যখন খিদে পায়, আমি তখন গলা বাড়িয়ে, উঁচু গাছের ডাল থেকে পাতা খাই। আমার কাছে তো কোনো খাবার নেই।’ এরপর দেখা পাখির সাথে। পাখি সব শুনে বললো, ‘ওই ওদিকে কাদার মধ্যে যাও। ওখানে অনেক খাবার আছে। আমি দেখেছি শুয়োর ওখানে খাবার ফেলে দেয়।’ এ কথা শুনে কুকুর কাদার মধ্যে খাবার খুঁজতে গেলো। কিন্তু কোথাও পছন্দ মতন খাবার পেলো না। ঘুরতে ঘুরতে শেষে আর একটা কুকুরের সাথে দেখা। সে বললো ‘আমার ও খুব খিদে পেয়েছে। চলো আমরা পুকুরে যাই। তাহলে মাছ ও পাবো। জল ও পাবো।’তারপর তারা দুজনে মিলে পুকুরে গিয়ে খুব মজা করে জল আর মাছ খেতে লাগলো। 

Khabarer Khonje

অনুলিখন: সোমদত্তা দেব 

The Stag’s Antlers

Shubhangi Aich

One day, there was a stag by a pond, drinking water. The stag had a majestic copper brown coat and eyes as black as the night itself. The stag had big, thick, strong antlers that gleamed in the sunlight while the dark chocolate colour stood out amongst the rest of the stag’s body. However, the stag had infirm and thin legs. The stag was complimenting how strong his dark brown antlers were and prided himself on the fact that he had immense antlers. On the other hand, he felt ashamed of his legs, exclaiming and seeing how thin they were and was upset and unhappy that he possessed such legs.

‘So, there is the stag! I shall soon have his antlers!’ whispered a person sidling about and hiding behind a thick, green bush. Armed with a gun, he spotted the stag while he was drinking water. While he was aiming the gun on it, the stag noticed him and took off at high speed while shrieking in terror and surprise. Out of the blue, he came up and collided against a bush of thorns. Panicking, he tried to search for a way out but in vain. The hunter then closed up on it, a wicked smile on his face as he aimed the gun on the stag. It still tried searching for a way out, frantically moving his legs out for escape while his eyes widened in fear, dread and consternation, believing that these were the last moments of his life. However, he found a gap in the bush. Using his legs, he widened the gap in the hole until it was enough for him to pass through. He gave a wide smile as he went past the hole at the speed of lightning and was free from the bush. His eyes twinkled as he was free from the bush, knowing that he could be alive and that his life would not be ended by a hunter’s gun. The happiness and contentment could be seen dancing in his eyes as he sprinted off from the bush away from the wicked hunter. The hunter cried ‘Oh blow it!’ as he watched the deer sprinting off into the deeper part of the forest to his freedom. Frustration boiled inside of him as he thought how victorious he would be if he caught the prestigious copper brown stag. He would feel victorious, triumphant and would be regarded as one of the greatest hunters in his area. But no, his dreams washed away with the deer as they slowly started leaking out of him.

The deer, meanwhile, was joyous beyond words when he broke free from the clutches of death. He exclaimed ‘My antlers have stood out and caught the notice of the hunter and almost had me killed. However, the legs which I had detested had saved my life!’ And so it did, as the stag galloped happily, leaving the hunter dejected.

The Blossoming Flower

Shubhangi Aich

I blossomed like a baby, my petals opened like eyes.
The sun’s brightness blinded me, and then I saw the skies.
Cloudy grey and periwinkle, with a hint of yellow as well,
The morning was a new dawn for me, I could tell.

The Sun glared at me o’er a lush hill
“Tis the season spring!” I turned still.
A boy came sprinting and fell on the ground.
Then I realized there was a lot of time left for the boy I found.

Day turned into night, the Sun was replaced by the moon.
The Moon was peaceful and calm, an uncelebrated boon.
The stars were guiding lights, they adorned the sky, did they not?
They did not appear large, they were just little dots.

As the time passed, my happiness was no more.
‘Cause I knew one day, I would leave Earth’s door.
I enjoyed being a flower, but now was my old age.
And slowly, I left, the last line of my final page.

Artworks

Blossoms - Advika Saha Blossoms — Advika Saha

Tulips - Aheli Ghosh Tulips — Aheli Ghosh

Bhashan - Adripto Ghosh Bhashan — Adripto Ghosh

Shokha o Shokhi - Payel Sahasardar Shokha o Shokhi — Payel Sahasardar

Home - Shruti Sinha Home — Shruti Sinha

Autumn - Rayan Seal Autumn — Rayan Seal

Butterfly - Oishani Mitra Butterfly — Oishani Mitra

Durga - Mehr Bhaumik Durga — Mehr Bhaumik